' বন্দে মাতরম’ এবং বঙ্কিম চন্দ্রের ইতিহাস ।

১০দিক২৪ঃ লখনউয়ের এক ব্যবসায়ী মালিক কাশিম হুগলি নদীর পাড়ে এক বিশাল বাড়ি নির্মাণ করেন, বর্তমানে যার ঠিকানা হুগলি জেলার চুঁচুড়া মহকুমা। প্রায় ৮ বিঘা জমির উপর বিশাল বাড়িটির ঠিক মতো দেখভাল না করতে পেরে কাশিমের ছেলে তা বিক্রি করে দেয় হাজিবাবা কাজারেনি নামে এক ব্যক্তির কাছে। পরবর্তী কালে বাড়িটি আরও এক দফায় হাতবদল হয়ে আসে পদ্মলোচন মণ্ডলের জিম্মায়। দু’টি ঘাট বিশিষ্ট এই বাড়িটির বর্তমানে একটিই অবশিষ্ট, অন্য ঘাটটি ঢাকা পড়ে গিয়েছে নানাবিধ নির্মাণের তলায়। এই দুই ঘাটের জন্যই জায়গার নাম ‘জোড়াঘাট’।

ঐতিহাসিকদের মতে, পলাশির যুদ্ধের সময় নির্মিত এই বাড়িটির বয়স এখন প্রায় ২২৫ বছর। ইতিহাস বাদ দিলে মালিক কাশিমের এই বাড়ির আরও একটি দিক আছে। ১৮৭৬-৭৭ সাল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তখন হুগলি জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর পৈতৃক ভিটে নদীর অপর পারে, নৈহাটির কাঁঠালপাড়া গ্রামে। চাকরির সুবাদে তাই বাড়ি ভাড়া করেন চুঁচুড়ায়। লেখালেখির সঙ্গে সঙ্গীত চর্চাও করতেন বঙ্কিমচন্দ্র। বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার করতেন মালিক কাশিমের এই বাড়িটি। সেই সময় বাড়ির মালিক ছিলেন কাশিম। তাঁর অগুনতি সৃষ্টির মধ্যে ‘আনন্দমঠ’ রচনা শুরু হয় চুঁচুড়ায় আসার আগে থেকেই। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের একাদশ প্রচ্ছদের জনপ্রিয় অংশ ‘বন্দে মাতরম’ কবিতাটির যে সুরের সঙ্গে পরিচিত আপামর দেশবাসী, সেই সুর সৃষ্টি হয় এই ভবনেই, তাই নাম হয় ‘বন্দে মাতরম ভবন’। গানটি কবিগুরুর কন্ঠেই সর্বপ্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৮৯৬ সালে। কবিতায় সুর দিয়েছিলেন ক্ষেত্রনাথ ভট্টাচার্য।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাংলায় রচনা ‘বন্দে মাতরম’ গানটি জনগণের কাছে স্বাধীনতার লড়াইয়ে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। বন্দে মাতরম্  বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ (১৮৮২) উপন্যাসের একটি গান। গানটি বাংলা-সংস্কৃত মিশ্রভাষায় রচিত। ১৯০৯ সালে শ্রীঅরবিন্দ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী এই গানটির ইংরেজি অনুবাদ করেন।  ‘জন-গণ-মন’-এর সাথে এই গানটি সমমর্যাদা পায়।  ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে এই গানটি জাতীয় স্তোত্র-রূপে জাতীয় সংগীতের সমমর্যাদায় গৃহীত হয়।

বর্তমানে ‘বন্দে মাতরম ভবন’ চুঁচুড়া পুরসভার ‘হেরিটেজ কমিটি’র তত্ত্বাবধানে। লাগোয়া ঘাটের দিক থেকে দু’টি ঘর খোলা থাকে দর্শনার্থীদের জন্য। প্রথম ঘরে বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর পারিবারিক বেশ কিছু ছবি আছে। দ্বিতীয় ঘরে রয়েছে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন মুহূর্ত-সহ নানা স্থাপত্যের ছবি। আসবাবহীন দু’টি ঘরের দ্বিতীয়টিতে রাখা আছে একটি আরামকেদারা। রামগতি ন্যায়রত্নের পরিবারের তরফ থেকে আরামকেদারাটি উপহার দেওয়া হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রকে।

কবিতা টি নিম্নে দেওয়া হল।

বন্দে মাতরম ।
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম
শস্যশ্যামলা মাতরম।
শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম
ফুল্লকুসমিত-দ্রুমদল শোভিনীম
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম
সুখদাং বরদাং মাতরম।
সপ্তকোটীকণ্ঠ-কল-কল-নিনাদকরালে
দ্বিসপ্তকোটীভূজৈর্ধৄত খরকরবালে
অবলা কেন মা এত বোলে!
বহুবল ধারিনীং ননামি তারিনীং
রিপুদলবারিনীং মাতরম।
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে
ত্বং হিং দুর্গা দশ প্রহরণধারিণী
কমলা-কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাং
নমামি কমলাম অমলাং অতুলাম
সুজলাং সুফলাং মাতরম
বন্দে মাতরম
শ্যামল সলাং সুস্মিতাং ভূষিতাম
ধরণীং ভরণীম মতরম।
...বন্দে মাতরম