কলমের কাঁচি ও হাতকড়া: মসিজীবি দের মসীহ হয়ে ওঠার ফল ? বিশেষ প্রতিবেদন।

লিখলেন, প্রখ্যাত আঁতেল নিগান্ত নটপুত্রঃ নৈতিকতা ধোপে টেকেনা ভোগবাদী দুনিয়ায়। কাগজে কলমে বিশ্ববিদ্যালয় নয়ত ইতিহাসের পাতায়। নাহলে খায় না মাথায় নাকি ইতিহাসের পাতায়! কোনো যায়গায় কি সাংবাদিকতার নৈতিকতা ধোপে টেকে না?

বেশ-কিছুদিন আগে একজন সাংবাদিক ভদ্র-সভ্য বেশে পশ্চিমী দেশে সোনার চামচ পকেটস্থ করতে গিয়ে বামাল সমেত ধরা পড়লেন। আজ স্বনামধন্য সুলেখক সাংবাদিকতার জগতে ঠোঁটকাটা বিপ্লবী সুমন চট্টোপাধ্যায় মহাশয় সেই পবিত্র গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসালেন। কিছুদিন আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বইয়ের সমালোচনা করে ফুটেজে থাকার চেষ্টা করার কারণে সমালোচিত। গতকাল চিটফান্ড কেসে গ্রেপ্তার হয়ে সোজা শ্রীঘরে। আরেকজন সাংবাদিকও অবশ্য একই কেসে শ্রীঘর অশিষ্ট ভাষায় মামারবাড়ি ঘুরে এসেছেন। যদিও কানাঘুষো শোনা যায় এককালের তেনার সহযোগী এই তাজা নেতা, তরুণ তুর্কী মসীজীবী তেনার চক্ষুশূল হয়েছিলো। তাই পচা শামুকে পা না কেটে বিনা যন্ত্রণায় পরিত্রাণের ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।



হঠাৎ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের নৈতিকতার ভীত নড়বড়ে? এটা জানতে চলুন কিছুটা ভণিতার সাথে গৌরচন্দ্রিকা করে একটু ইতিহাসে ডুব দি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ইতিহাস দুই শতকের। ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র জেমস অগাস্টাস হিকির বেঙ্গল গেজেটের সময় থেকে চলে আসছে এর ধারা। বিপুল দেনা আর তৎকালীন গভর্নরজেনারেল ওয়ারেন হেষ্টিংস এর পারিবারিক কেচ্ছা ছাপার অপরাধে দু বছরের জেল। এবং ভাগ্যের ফেরে কাগজ শুরুর দু বছরের মাথায় কাগজ বন্ধ। এর পরেও অনেক সাংবাদিক সম্পাদক রা গ্রেপ্তার হয়েছেন বটে তবে কেচ্ছা বা চোর অপবাদে নয় সংগ্রামী ইতিহাসে বৃটিশ বিরোধিতার স্বাক্ষর রেখে। কলকাতার অলিগলি জানে সাংবাদিকদের কঠিন জীবনের ইতিবৃত্ত। এক কালে বিয়ের জন্য সাংবাদিকরা উপযুক্ত পাত্র বলিয়া বিবেচিত হতেন না কারণ পেশা তেমন অর্থকরী ছিলো না। ক্রমে দেশ স্বাধীন হয় সাংবাদিকতার ধারার পরিবর্তন হয়। তবে সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করার অধিকার সরাসরি সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় না। কেবল মাত্র ১৯নং ধারায় মতপ্রকাশের অধিকারের মধ্যে গন্ডি সীমাবদ্ধ রাখে।

স্বাধীনতার পরিস্থিতিও সুখকর ছিলোনা। সরকার ও সরকারী দলের মনোভাব ছিলো সাংবাদিকদের জন্য বিদ্বেষমূলক। সর্বনাশের মাথায় পা দিয়ে আসে জরুরি অবস্থা। সেন্সরের কাঁচিতে রবীন্দ্রনাথ ও কাটা পড়েন ক্রমশ। স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য গৌরকিশোর ঘোষ থেকে বরুণ সেনগুপ্ত জেলে গেছেন নিজেদের মেরুদণ্ড সোজা রেখে। নিউ মিডিয়া বা মিডিয়া বুম যেটা উনবিংশ শতকের শেষের বিবিধ মাধ্যমকে মানুষের সামনে নিয়ে আসে।



আর্থিক উদারীকরণের সাথে সাথে কর্পোরেট বৃহৎ পুঁজির বিকাশ। অরাজনৈতিক দলগুলির হাতে বিপুল অর্থ আসায় সংবাদমাধ্যমকে নিজের অনুকূলে ব্যাবহারের প্রসঙ্গ আসে। মানুষ কে প্রভাবিত করে ভোটের রায় নিজের অনুকূলে আনতে হিড়িক পড়ে যায়। মিডিয়ার কর্পোরেট মালিকরা সরকারী প্রকল্প থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার যায়গায় এসে ব্যবসায় লাভ খোঁজার চেষ্টা করে। প্রচুর অর্থের লেনদেনের সাথে বাসা বাঁধে তীব্র লোভ যার ফলে প্রভাবিত হয় খবরের গুণমান।

সাংবাদিকতা পড়ার সময় জেনেছি সংবাদ হল যথাযথ স্বল্প তথ্যের বিষয়মূখী প্রকাশ। এখন সাধারণ খবরেও মিডিয়া হাউস তথা সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত অভিমত খবরের কাগজ থেকে টক শো আলো করে। মানুষের মাথায় নিজের জ্ঞানের বহর চাপিয়ে দিয়ে তার অভিমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়। অর্থের বিনিময়ে জনমত প্রভাবিত হয় বারেবারে। এইভাবেই হলুদ সাংবাদিকতা হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ দিয়ে দেহে ইনজেক্ট করা হয়। আর তরতড়িয়ে বেড়ে ওঠা গতিশীল ভোগবাদী সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে নৈতিকতা আদর্শ পদের গুরুত্ব লুটোয় পাপোষে পড়ে থাকে শুধু লোভ। আর সেই লোভের শেষ হয় শ্রীঘরে।