'কষ্টের কামাই, খেয়ে গেল জামাই' প্রসঙ্গ জামাই ষষ্ঠী।

১০দিক২৪ এর কলমেঃ  জামাইষষ্ঠী মানেই আগাপাশতলা বাবাজীবনদের অনুষ্ঠান, পঞ্চ (বা পঞ্চান্ন) ব্যঞ্জনে ভুড়িভোজ। এমন দিনে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে মিষ্টির ঝোলা ও বিশাল মাছ হাতে শ্বশুরবাড়িতে হাজির হতে পছন্দ করেন অনেক জামাই। আর আজকালকার নিউক্লিয়ার ফ্যামেলিতে একমাত্র মেয়ের বরের আদরের ঘটা যে কতটা সেটা লিখে প্রকাশের ক্ষমতা হয়ত দুনিয়ার কোন সাংবাদিক বন্ধুরই নেই।

বাঙালি সমাজে প্রচলিত প্রবাদ আছে 'যম-জামাই-ভাগনা- কেউ নয় আপনা'। আবার এযুগের শ্বশুররাও আড়ালে আবডালে গুনগুনিয়ে ওঠেন, 'কষ্টের কামাই, খেয়ে গেল জামাই'। সে যাই হোক, ভুড়িভোজে বাঙালীর জুড়ি মেলা ভার, আর আজকের দিনটা বিবাহিত পুরুষ দের কাছে প্রধানত 'ভুড়িভোজ দিবস' হিসেবেই প্রাধান্য পেয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে।


এবার খাবারের থালা থেকে নজর ঘুরিয়ে, চলুন একটু ঘুরে আসি জামাইষষ্ঠীর সূচনা পর্বে। ভারতীয় দেবতাদের প্রধানত দুটি ভাগ। প্রথমটি আর্য দেবতা এবং দ্বিতীয় টি অনার্য দেবতা। এই অনার্য দেবতার মধ্যে অন্যতম হলেন শিব, কালী, মনসা প্রভৃতি। মূলত মা ষষ্ঠী ও তাদের মধ্যে অন্যতম। যিনি শুধু বাংলার এক গ্রাম্যদেবীই নন, শীতলা ও মনসার মতোই ভারতের নানা অঞ্চলে পূজিত হন তিনি। হরপ্পাতেও প্রাগৈতিহাসিক এমন দেবীমূর্তি পাওয়া গেছে, যা দেখে নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেছেন, সিন্ধু সভ্যতাতেও ষষ্ঠীর আরাধনা চলত। সন্তান জন্মের সঙ্গে ষষ্ঠীর পুজোর বিশেষ যোগ ছিল বলে মনে করতেন প্রাচীন মানুষরা।

বিহারে সন্তানজন্মের পরে ছ’দিনের অনুষ্ঠানটিকে ছ’ঠী বলা হয়, ষষ্ঠী সেখানে ছ’ঠী মাতা, সন্তানহীনা দম্পতিরা তাঁর আরাধনায় ব্রত পালন করেন, ষষ্ঠী ব্রত। ওডিশায় সন্তানজন্মের ছ’দিন এবং একুশ দিনে এই দেবী পূজিত হন। উত্তর ভারতের কোথাও কোথাও বিয়ের সময়েও ষষ্ঠীর পুজো করা হয়।


জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষে সাবিত্রী চতুর্দশীতে স্ত্রীরা স্বামীর দীর্ঘজীবন কামনা করে যমের আরাধনা করেন। মনেকরা হয়, এই লোকাচারটির সূত্র ধরেই কলকাতার বাবু সংস্কৃতি এই ষষ্ঠীটি জামাইকে নিবেদন করেছিল। আঠারো-উনিশ শতকে বাংলার সচ্ছল শ্রেণির মধ্যে বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন হয়, ফলে অগণিত বালবিধবার যন্ত্রণাময় জীবন, বিস্তর সতীদাহ। সেই সময় প্রচলিত একটি প্রবচন ছিল:

"পুড়বে মেয়ে, উড়বে ছাই
তবেই মেয়ের গুণ গাই!"

এই অবস্থায় জামাই ও স্বামীর দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা বাঙালি মা এবং মেয়ের পক্ষে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অন্তত কলকাতা ও চার পাশের এলাকায় সন্তানের মঙ্গলকামনার চেয়ে এর গুরুত্ব বেশি ছিল।


প্রাচীন কালে, বিবাহিত মেয়েদের বাপের বাড়ি যাবার সুযোগ প্রায় হত না বললেই চলে। আর একা একা বাড়ি থেকে বাড়ির বউ বেড়িয়ে বাপের বাড়ি যাবে একটা সময় এটা ভাবাই যেতো না। তাই 'মেয়ে'কে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য এই দিন টি এতটা প্রচলিত হয়ে ওঠে। মেয়ে কে দেখার সুযোগ করে দেবার ঘুষ হিসেবেই জামাইয়ের জন্য ভুড়িভোজের আয়োজন করা হত।

তবে সেসবই এখন অতীত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে জামাইষষ্ঠী উদযাপনের পদ্ধতিও। এখনকার কর্মব্যস্ত জামাইরাও আর ফুলবাবুটি হয়ে উপস্থিত হননা। এখন জামাইষষ্ঠী হয় ব্যস্ত মেয়ে জামাইএর কোনো ছুটির দিন দেখে বা রবিবার। তবে ভোজনরসিক বাঙালীর সুযোগ দরকার কবজি ডুবিয়ে খাবার। আর সে সুযোগ নিয়ে বারবার আসুক জামাইষষ্ঠী। আসুক বাঙালীর রসনার শান্তি নিয়ে।